মহিলা সিটে পুরুষ বসলে ৫০০০ টাকা জরিমানা গুনতে হবে

নারীদের সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হয়েছে।

মেয়ে, শিশু, প্রতিবন্ধী এবং প্রবীণ যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড  রেখে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। ২২ অক্টোবর আইনটি কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট জারি করে সরকার। বাসে মেয়েদের নিত্য ভোগান্তি নতুন কোন বিষয় নয়। মহিলা সিটে প্রায়ই পুরুষ বসে থাকে। কিংবা এমনও দেখা যায় যে, কোন কোন বাসে মহিলা সিট লেখাই নেই। তাই বিষয়টি মাথায় রেখেই নতুন এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

আমাদের নারীদের প্রতিদিনের কিছু ভোগান্তি এখানে তুলে ধরা হল।

ঘটনা ১

সুমি বাসে করে কলেজ থেকে ফিরছিল। মহিলা সিটের ৯টির ৪টিতে বসে আছে পুরুষ যাত্রী। কেউ ঢুলছে, কেউ অন্য দিকে তাকিয়ে আছে, নির্বিকার, কেউ কানে হেড ফোন লাগিয়ে বসে আছে। সুমি পাশে দাঁড়িয়ে বলল, সিট ছাড়েন, এটা মহিলা সিট। তাঁরা এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন শুনতেই পাচ্ছেনা। অন্য নারী যারা বসে আছেন, তারাও কিছু বলছেনা। টিকিটের বাস হওয়ায় হেল্পার ছেলেটিও যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। সুমি অসহায়ের মত এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে তাঁর গা ঘেঁসে যাত্রীরা চলে যাচ্ছে। দু’একজন পুরুষ যাত্রী গা ঘেঁষে যাবার সময় ইচ্ছে করে তাঁর স্পর্শকাতর স্থান ছুঁয়েও গেছে। সে সহ্য করতে না পেরে আরেকবার তাঁর পাশে বসা পুরুষ যাত্রীকে বলে উঠল, সিট ছাড়েন। এবার প্রায় সবাই ঘুরে তাকাল। একজন বলল, ‘এত চেতেন ক্যান। সমান অধিকার চাইয়া তো গলা ফাটান, আবার নারীর জন্য আলাদা সিট চান’। তখন সে ও প্রতি উত্তর করে। তখন পাশ থেকে আরেকজন বিদ্রূপ করে বলে, ‘এত ঝগড়াটে, ঘর ঠিক নাই, আবার বাইরে বের হয় ক্যান’, হেল্পার এসে বলে, ‘আপা অশান্তি কইরেন না তো’। পাশে বসা নারী যাত্রীরা কেউ কোন কথা বলছেনা। এই সাধারণ দৃশ্য নিত্যকার। নারী প্রতিবাদ করে এবং নিজের অধিকার চাইতে গিয়ে এভাবে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে প্রতিদিন যায়।

ঘটনা ২

রাত সাড়ে আটটা। রাজধানীর গাজীপুর গামী বাস। এয়ারপোর্ট পার হবার পর যাত্রী সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। রুমা বাসের মাঝামাঝি একটি আসনে একা বসে ছিল। সে দেখল হেল্পার আর ড্রাইভার কি যেন বলাবলি করছে। তারপর হেল্পার তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখল। হেল্পার ছেলেটি তরুণ এবং তাঁর চোখ অসম্ভব লাল। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল ছেলেটি তাঁকে কিছু না বলে বাসের পেছনে বসে থাকা কয়েকজন যাত্রীকে নেমে যেতে বলল, কারণ গাড়ি নাকি আর যাবেনা, সে স্পষ্ট শুনতে পেল। যাত্রীরা নেমেও গেল। হেল্পার ছেলেটি তখনও তাঁর সিটের পেছনে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু তাঁকে নেমে যেতে বলল না। সে খুবই অনিরাপদ বোধ করতে লাগল, কারণ ড্রাইভার ও হেল্পারের চাহনি অস্বস্তিদায়ক ছিল। সেও উঠল। তখন হেল্পার বলল, আপা আপনার নামা লাগবেনা। তখন তাঁর সন্দেহ হল। কয়েকদিন আগে রূপা নামের এক মেয়ের মৃত্যুর খবর দেখেছে সে। মেয়েটিকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। রুমা আর দেরী না করে দ্রুত উঠে এসে দরজার কাছে চলে এলো। তখনও বাস ধীরে ধীরে চলছিল। সে ড্রাইভারের বাস থামানোর অপেক্ষা না করে লাফ দিয়ে রাস্তায় নামতে চাইল। কিন্তু ছিটকে গিয়ে ফুটপাতের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। খুব ব্যথা পেল। ভাগ্য ভাল কয়েকজন পথচারী তাঁকে হাত ধরে তুলল।

ঘটনা ৩

পাপড়ি পাশের আসনে বসেছে এক মধ্যবয়স্ক লোক। একটু পরপর সে তাঁর মুঠোফোনের দিকে তাকাচ্ছে, তাঁর দিকে অকারণে ঝুঁকে আছে। সে কয়েকবার তাঁকে সরে বসতে বলা সত্ত্বেও কাজ হয়নি। তারপর সে সুপারভাইজারকে বলল লোকটির আসন পরিবর্তন করে দিতে। এবার লোকটি উলটো তাকেই দোষারোপ করতে লাগল। এক কথায় দু কথায় অন্য যাত্রীরাও বিরক্ত হয়ে বলল দুজনকেই নামিয়ে দিতে। পাপড়ি প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করতে লাগল। সে বাস থেকে নেমে গেল মাঝ রাস্তায়।

নারীদের হয়রানীর পরিসংখ্যান

উপরের তিনটি ঘটনাই বাস্তব এবং সত্য ঘটনা, শুধু নামগুলো পরিবর্তন করতে হয়েছে। গণ পরিবহনে নারী নির্যাতন ও হয়রানী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সংখ্যায় বেড়েছে যা আশংকাজনক। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী,। সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ মাসে গণপরিবহনে ২১ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। গত আড়াই বছরে দেশের বিভিন্ন গণ পরিবহণে ৫৩টি বড় ধরণের নারী যাত্রী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু গত বছরেই ঘটেছে ১৭টি। এরমধ্যে আবার রাজধানীতেই ঘটেছে সাতটি। এসব ঘটনায় দুই একজন অপরাধী গ্রেফতার বা আটক হলেও বেশির ভাগেরই বিচার হচ্ছে না। অনেকে আটক বা গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে আসছেন, আবারও জড়াচ্ছেন একই ধরণের অপরাধে।

আরো পড়ুন  খুলনায় জিআরপি থানায় ওসিসহ ৫ পুলিশের বিরুদ্ধে গণধর্ষণের অভিযোগ

ব্র্যাক প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গণ পরিবহনে বিভিন্নভাবে ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ নারীই চলন্ত বাসে নামার সময় এবং ওঠার সময় হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। তবে বেশিরভাগই প্রতিবাদ করেন না। যদিও এসব ঘটনায় শতাধিক মামলা তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র।

এদিকে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালেই শুধু মার্চ ও এপ্রিল মাসে বাংলামটর থেকে শাহবাগ পর্যন্ত চলন্ত বাসে ৩২টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে।

গণ পরিবহণ আইন কি বলে

গণ পরিবহনে নারী যাত্রী হয়রানী কমানোর জন্য এবং নারী যাত্রীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গণ পরিবহনে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিধান করে।পরবর্তীতে বড় বাসে ৯টি, মিনিবাসে ছয়টি এবং বিআরটিসি বাসে ১৪টি আসন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত হয়।

‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭’-এর খসড়ায়ও বলা হয়েছিল, ‘গণ পরিবহনে নারী, শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে তাদের বসতে না দিয়ে অন্য কেউ ওই আসনে বসলে তিনি এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

কিন্তু বাসে উঠে দেখা যায় সংরক্ষিত নারী আসনও কিছু পুরুষ দখল নিয়ে বসে আছেন। তাই নারীদের গাদাগাদি করে বসতে হয় ড্রাইভারের পাশে ইঞ্জিনের তাপে তপ্ত বনেটের ওপর। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে ১ ঘণ্টার অধিক দাঁড়িয়ে থাকা একটানা এবং তপ্ত কোনকিছুর উপরে আধা ঘণ্টার বেশি বসে থাকা নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

নারী আসন কেন

অনেকেই বিশ্বাস করে সম অধিকার দাবি করলে নারীর জন্য সবজায়গায় সংরক্ষিত আসন প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই ধারণাটি ভুল। একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে বোঝা দরকার সম অধিকার নারীর মৌলিক ও জন্মগত অধিকার। যে পরিমাণ নারীর অংশগ্রহণ সর্বক্ষেত্রে দরকার, সেই সংখ্যক নারী বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে উঠে আসতে পারছেনা। ফলে রাষ্ট্র ও সরকার তাদের সম অধিকার নিশ্চিত করতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর জন্য আসন সংরক্ষিত রেখেছে, সেটা সংসদ হোক, সরকারী চাকুরী হোক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হোক কিংবা গণ পরিবহনের আসন হোক।

আরো পড়ুন  "খেলাধুলার মাধ্যমে বিকশিত হোক আগামী প্রজন্ম!"- রোটারীয়ান মিজানুর রহমান

আরেকটি বিষয় জানা দরকার সকলের আর তাহলো, গণ পরিবহনের সুনির্দিষ্ট সংরক্ষিত আসনের বাইরে বাকি আসনগুলো সাধারণ, অর্থাৎ নারী পুরুষ উভয়ের জন্য। সংরক্ষিত আসনগুলো শুধু নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের, ঐ সংরক্ষিতগুলো পূরণ হয়ে গেলে বাকিগুলোতেও তাঁরা বসতে পারবেন।

হয়রানী ও নির্যাতনে করণীয়

নারী যাত্রীর হয়রানী ও নির্যাতন বন্ধ বা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে আসলে নারী পুরুষ এবং রাষ্ট্রকেও।

– বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ২৮ হাজার ২২২, আর রাজধানীর বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন সাত হাজার বাস চলে। এর মধ্যে সরকারি পরিবহন বিআরটিসির বাস ৪০০টি। কিন্তু নারীদের জন্য বাস আছে মাত্র ১৫টি! তাও সরকারি পরিবহন সেবা বিআরটিসির। তাই নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার পাশাপাশি অন্য সব বাসে নারীদের জন্য কমপক্ষে ২০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখার বিধান করা যেতে পারে।

  • সরকারি তদারকির অংশ হিসেবে ভেজাল খাদ্য বিরোধী মোবাইল কোর্টের মতো বাসের ভেতরও নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে যেকোনো পরিবহনে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের অভিযান চালাতে হবে।
  • পুরুষদের ধৈর্যশীল, ত্যাগী ও সহনশীল হতে হবে। অর্থনীতির চাকা পুরুষ একা ঘোরায় না, অধিকার ও স্বাধীনতা তাঁর একলার শুধু জন্মগত অধিকার  নয়, নারীরও। বৃহৎ স্বার্থে আসন ছাড়ার মত ক্ষুদ্র ত্যাগ না করতে পারলে শিক্ষিত হয়ে কোন লাভ নেই।
  • গণ পরিবহনে নারী ধর্ষণ ও খুনের মত ন্যাক্কারজনক ঘটনার পেছনে মাদকের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। প্রতিটি খুনের অপরাধীর মাদকাসক্তির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। অতএব , মাদকের সুলভতা, গন পরিবহণ শ্রমিকদের মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়া, মাদক বাণিজ্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রশাসনকে যেকোনো মূল্যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং বাস্তবায়ন করতে হবে সততার সাথে।
  • নারীদের নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য ক্যারাতে ইত্যাদি শিখতে হবে যাতে যেকোনো বাজে পরিস্থিতিতে অন্তত নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারে।
  • কম যাত্রী থাকলে বাস থেকে নেমে যেতে হবে বা ঐ বাসে ওঠা যাবেনা। পরিস্থিতি খারাপ বুঝলে ৯৯৯ নাম্বারে ফোন দিতে হবে।
  • আমাদের দেশে গণ পরিবহনে চালক ও সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো নিয়ম মানা হয় না আসলে। মালিক পক্ষ তাদের ইচ্ছামতো পরিবহন শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। গাড়িতে চালক ও সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের নিয়োগপত্র দিতে হবে, যাতে বিভিন্ন শর্তের উল্লেখ থাকবে। তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে এবং অতীতের কর্মকাণ্ড যাচাই করে ছবি ও দরকারি সব তথ্য নিয়ে তবেই নিয়োগ দিতে হবে, যাতে কোনো অপরাধ করলে তাঁদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া  যাত্রীদের সঙ্গে তাঁদের আচরণ কেমন হবে, সে ব্যাপারে বাসের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণও মালিকদের দিতে হবে।

পরিশেষে…

শুধু আইন করে এ ধরণের অপরাধ কমানো যায়না। সম্প্রতি রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চারজনকে ফাঁসির আদেশ ও একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই রায়ের মধ্য দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলেও তা গণ পরিবহনে নারীর নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে এমন কথা হলফ করে বলা যায় না। সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য মূল্যবোধ ও নৈতিকতা চর্চা করাও দরকার। নারীকে শুধু নারী নয়, মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি চর্চা ও নির্মাণ করতে হবে।

Dhaka News Time