“নদী ও শহর” দিয়ে যাত্রা শুরু করলো ডাকনাম - Dhaka News Time

“নদী ও শহর” দিয়ে যাত্রা শুরু করলো ডাকনাম

“সালটা ২০০৮ এর মাঝামাঝির দিকে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা সবেমাত্র শেষ করেছি। গিটারের প্রতি আলাদা একটা টান ছিলো। এক পরিচিত বড় ভাইয়ের কাছে গিটারের ক্লাস করতাম। কয়েকটা পরিচিত গান গিটারে তুলতে পারতাম। তো- প্রায় প্রায়ই সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে রূপনগরের ঝিলপাড়ে বসে গানবাজনার আড্ডা চলতো। একদিনের কথা। আমি গিটার নিয়ে যেয়ে দেখি ২-৩ জন বন্ধু চলে এসেছে। কিছুক্ষণ বসার পরই সবাই আমাকে বললো, “তুই থাক আমরা গেলাম।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?” বললো, “আজাদ আসবে এখন আর এসেই  কমপক্ষে ১০-১২ টা গানের লিরিক শোনাবে।” সবাই চলে গেলে আজাদ আসলো। আমি বসেই ছিলাম। কথায় কথায় একদিন আজাদকে বললাম, “আজাদ তোর লেখা একটা লিরিকের সুর করি চল।” সেই সুর করতে যেয়ে ঘন ঘন একসাথে বসে মিউজিকের আড্ডা দিতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। এই আড্ডাটা অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো আমাদের। অন্য একদিন আজাদ সাথে করে ওর এক ছোট ভাইকে নিয়ে এলো। নাম দ্বীপ। ভালো গিটার বাজায়। তো আমরা তিনজন বেশ জমিয়ে গিটার বাজাতাম, গল্পগুজব করতাম, আড্ডা দিতাম, লিরিক নিয়ে আলোচনা করতাম। তার বেশ কয়েক দিন পর কথার প্রসঙ্গে একদিন আজাদ বললো, “চল একটা ব্যান্ড ফর্ম করি আমরা।” আমি বললাম, “ব্যান্ড ফর্ম করা যায় কিন্তু আমরা তো মোটে তিনজন। আর তিনজনই গিটার প্লে করি। ভোকাল, ড্রামার এদের কই পাবি?” আজাদ তাৎক্ষনিক এক বন্ধুর নাম মনে করলো যে ড্রাম বাজানোর পাশাপাশি ভোকালও দিতো। তো বেসিক্যালি এই ছিলো আমাদের ব্যান্ডের একেবারে শুরুর দিকের কথা।”

কথা বলছিলাম মিরপুর রূপনগরের ব্যান্ড ডাকনাম এর গিটারিস্ট এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুশফিক এর সাথে। প্রত্যেকটা ব্যান্ড গড়ে উঠার পেছনের গল্পটা সবসময়ই আড়ালেই থাকে। সবাই শুধু সাফল্যের কথাই শুনতে চায় কিন্তু সাফল্যলাভের জন্য যে ত্যাগ-তিতিক্ষার গল্প তা খুব কম মানুষই শুনতে চায় বা জানতে চায়। আজ ডাকনাম ব্যান্ডের সদস্যদের কাছ থেকে তাদের ব্যান্ডের পেছনের গল্পগুলোই শুনবো। তবে হ্যা ব্যান্ডের শুরুটা হুটহাট করে হলেও ব্যান্ডের যাত্রাপথটা এতটা সহজসাধ্য ছিল না বলেই জানায় ব্যান্ডের সদস্যরা। ব্যান্ডের প্রধান ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বেইজিস্ট আজাদের সাথে কথা হয় এবার।

“শুরুর দিকের কথা বলতে গেলে কোথাও বসে আড্ডা দেয়া আর আড্ডার মাঝে মাঝে গানবাজনা করাটাই ছিলো আমাদের জন্য ব্যান্ড করা। আমাদের তখনকার যুগটা এখনকার মতো এত ফাস্ট ছিলো না। আর সে সময়ে মিউজিক করাটা যেন একধরনের অপরাধ ছিলো। এলাকার লোকজন এমনকি পরিবারের লোকজনও বেশ তীক্ষ্ণ চোখে দেখতো। মিউজিক নিয়ে কথা বলেছেন তো আপনি এলাকার এক নাম্বার বেয়াদব এবং লুকিয়ে ছুপিয়ে মদ-গাজা খাচ্ছেন। তো এর জন্য যেটা সমস্যা হতো সেটা হলো বাসায় গিটার প্র‍্যাকটিস করা একেবারে হারাম ছিলো বলতে গেলে আর ইলেকট্রিক গিটার সে আমাদের জন্য স্বপ্ন ছিলো ঐ সময়। পরিবার আর এলাকা মিলিয়ে আমাকেও অনেক কথা শুনতে হয়েছে। সে যাই হোক এসব কথা বললে শেষ হবে না বরংচ বাড়বে। তার চাইতে এত কাঠখড় পুড়িয়ে যেদিন প্রথম প্র‍্যাকটিস প্যাডে গেলাম সেদিনের কথাটা বলি। অনেক কষ্টে টাকা-পয়সা জোগাড় করে ৪ ঘন্টার জন্য একটা প্র‍্যাকটিস প্যাড ভাড়া নেই আমরা। যাদের গিটার ছিলো না তারা কিভাবে যেন এর-ওর কাছ থেকে ম্যানেজ করে নিয়ে এসেছিলো। 

আর তখনকার সময়টা লোডশেডিং এর ক্রেজ ছিলো। এক ঘন্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যেত। তো সেদিন ৪ ঘন্টার জন্য প্র‍্যাকটিস প্যাড নিলেও মূলত আমরা লোডশেডিং এর জন্য দুই ঘন্টা পেয়েছিলাম। প্রথম ১ ঘন্টা তো নার্ভাসনেস আর হাবিজাবি চিন্তাতেই কেটে গেলো। আর পরের ঘন্টায় একটা নামীদামী গান কাভার করতে করতেই চলে গেল। এই তো ছিলো শুরুর কথা। মুশফিকের বলা শুরুটা ছিলো অনেকটা অনানুষ্ঠানিক আর আমি যেটা বললাম সেটা আমাদের আনুষ্ঠানিক ছিলো অনেকটাই যদিও এই সময়ে ব্যান্ডের নাম ছিলো ভিন্ন। তবে মূল ডাকনাম এর যাত্রা নিয়ে দ্বীপ বলুক।”

আমাদের আড্ডার মাঝেই ব্যান্ডের অন্য লিড গিটারিস্ট দ্বীপ আসে। শুধুমাত্র লিড গিটারিস্ট বললে হবে না কেননা ডাকনাম ব্যান্ডের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের কাজও দ্বীপই করে। ডাকনাম এর নিজস্ব স্টুডিও ‘ডাকঘর’ এর সকল দায়িত্ব দ্বীপেরই বলে জানায় বেইজিস্ট আজাদ। ডাকনাম ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আবারো জানতে চাই দ্বীপের কাছে।

“যদি ডাকনাম ব্যান্ডের অফিশিয়াল শুরুর কথা বলতে হয় তাহলে মিরপুর ১১ নাম্বারের বাংলা স্কুলের মাঠে এক কনসার্টের কথা অবশ্যই বলতে হবে। সেই সময়টাতে ব্যান্ডের অন্য নাম ছিলো। আর সে কনসার্ট পারফর্মেন্সের কয়েকদিন আগেই ব্যান্ডের নামটি পরিবর্তিত হয়ে ডাকনাম নামটি আসে। তাই এটাকে আপনি অফিশিয়াল ডাকনাম যাত্রা বলতে পারেন। এরপর থেকেই আমরা মূলত ডাকনামকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। হ্যা এখনো যাচ্ছি আর সামনে অনেক দূরে যাওয়ার ইচ্ছা আর স্বপ্ন দুটোই আছে।”

২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ‘ডাকনাম’ ব্যান্ডটি মূলত একটি রক ঘরানার ব্যান্ড। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আশা করা যাচ্ছে আগামী ২৩ শে মার্চ ২০১৮ ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ডাকনামের প্রথম এলবাম ‘নদী ও শহর’ প্রকাশ পাচ্ছে। এ নিয়ে বিস্তারিত জানায় ব্যান্ডের ড্রামার ও সর্বকনিষ্ঠ সদস্য অনল।

“২৩ শে মার্চ শুক্রবার বিকাল চারটায় আমাদের ডাকনাম ব্যান্ডের ফার্স্ট এলবাম আসছে। এতে মোট ৯টি গান থাকছে। প্রথম অবস্থায় আমাদের নিজস্ব স্টুডিও ডাকঘর এ গানগুলোর টেক নেয়া হয় তবে মাস্টার মিক্সিং এর জন্য স্টুডিও ভেলকি’র রোকন ইমন ভাইকে অনেক ধন্যবাদ। আমাদের গানগুলো লিরিক বেজড। সাবজেক্টিভ লিরিক নিয়ে কাজ করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি আমরা। লিরিকের ভাজে আর সুরের খাজে একেকটা জীবনেরর গল্প দিতে চাই আমরা। প্রথম এলবাম তাই খুব বেশী সময় নিয়েছি। যাচাইবাছাই করেছি খুব বেশী। চেষ্টা করেছি নিজেদের সর্বোচ্চটা দিতে বাদবাকিটা শ্রোতারা বলবে।”

ডাকনাম ব্যান্ডের প্রথম এলবাম এর নাম ‘নদী ও শহর’। এই নামটা কেন বা এই নামের বিশেষত্ব কি? আড্ডার মাঝে এরকম প্রশ্ন উঠলে ব্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভোকাল তন্ময় নিজে থেকে উত্তরটা জানায় আমাদের।

“কিছুদিন আগে আমাদের এলবামের কাজ চলাকালীন সময়ে এরকম এক ইন্টারভিউতে বলেছিলাম  আমরা গান লিখি জীবন থেকে। জীবনের গল্প নিয়েই তাতে সুর দিই। তাই আমাদের এলবামের নাম হবে গানের চরিত্রের সাথে মিল রেখেই। তো ‘নদী ও শহর’ এলবামের প্রথম গানটা ‘নদী’ দিয়ে শুরু হয়ে গ্রামের মেঠোপথের কিশোরীর হাসিমাখা মুখ, নাগরিক ভালোবাসা, প্রেম, আনন্দ, বিষাদ সবকিছুকে সাথে নিয়ে শেষ করবে ‘শহর’ গান দিয়ে। ভাবুন না একটা সময় আমাদের এই শহরটা শুধু নদীর ছিলো। নদীটা নিজের বুক উজাড় করে শহরকে ভালোবেসে জায়গা করে দিলো আর শহরটা নিজের বুক ভারী করে আমাদেরকে ঠাই দিলো। আশা করি সবাই এইভাবে ভেবেই হারিয়ে যাবেন ‘নদী ও শহর’ এর সুরে।”

মানুষ হয়তো তখনই খুব বেশী আশা আর বিশ্বাস নিয়ে সাফল্যের কথা বলে যখন তারা অনেকটা বাধাবিপত্তি ঠেলে নিজেকে উজাড় করে সামনের দিকে এগিয়ে আসে। ‘ডাকনাম’ ব্যান্ডের সদস্যদের আশা আর বিশ্বাস সত্যিই মুগ্ধ করে। ‘নদী ও শহর’ এলবামের গানগুলো যথাক্রমে নদী, রোমানা, ইচ্ছের চোরাচালান, দুঃস্বপ্ন, আহ্বান, বাঙালী, সাংবাদিক পরিবার, চোখ এবং শহর। ‘ডাকনাম’ ব্যান্ডের একটা ‘ডাকঘর’ আছে। ‘ডাকঘর’ হলো ডাকনাম ব্যান্ডের নিজস্ব স্টুডিও। এখানেই মূলত লিরিক, গানের সুর নিয়ে আলোচনা, গানের টেক বা মিক্সিং কিংবা বলা যায় ‘ডাকঘর’ হলো ডাকনামের গানগুলোর আঁতুড়ঘর। ব্যান্ডের নামের নামকরনটা কিভাবে এরকম প্রশ্নের উত্তরে বেইজিস্ট আজাদ জানায়।  

“আসলে দেখুন আমাদের সকলেরই একটা পরিচয় আছে। সবারই কিছু নিজস্ব ইচ্ছা বা কিছু করে দেখানোর নেশা থাকে। কিংবা কিছু ক্ষোভ-আক্ষেপ থাকে বা অব্যক্ত কিছু কথা থাকে যা কখনো বলা হয় না। একটা সময়ে তা গভীরে তলিয়ে যায়। অনেক বছর পর হয়তো কেউ ঐ কথা বা অনুভূতিগুলো নিয়ে নাড়া দিলে মনটা আন্দোলিত হয়, রোমাঞ্চিত হয়। এই যে আবেগটা, এই যে রোমাঞ্চটা এই ব্যাপারগুলোই মূলত আমরা ধরে রাখতে চাই। যাতে আমাদের ইচ্ছের চোরাচালান না হয়, যাতে সময়ের অজান্তে হারিয়ে না যায়। আর এই ধরে রাখাটাকে আমরা সুরের চিঠি বানাতে চাই। কিন্তু এই চিঠিগুলো যে আমরা মানুষের কাছে দিবো তার জন্যও কিন্তু একটা নাম দরকার। একটা পরিচয় দরকার। তাই আমরা ‘ডাকনাম’ ‘ডাকঘর’ কে প্রেরকের ঠিকানায় রেখে চিঠিগুলো পৌঁছে দিতে চাই প্রাপক হিসেবে পুরো বাংলাদেশের কাছে।”

‘ডাকনাম’ ব্যান্ডের সদস্যদের সাথে আরো একবার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, ব্যান্ডের প্রধান ও প্রতিষ্ঠাতা- আজাদ (বেইজিস্ট), গিটারিস্ট ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য- মুশফিক (রিদম), গিটারিস্ট-দ্বীপ (লীড/রিফ), ড্রামার- অনল এবং ভোকাল আর কি-বোর্ড- তন্ময়। আগামী ২৩ শে মার্চ শুক্রবার বিকাল চারটায় ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ব্যান্ড মিউজিক এক্সপ্রেস এর পক্ষ থেকে এক উন্মুক্ত কনসার্টে রিলিজ হচ্ছে ডাকনামের এলবাম। এ কনসার্টে ব্যান্ড ডাকনামের সাথে আরো থাকছে ব্যান্ড দূরবীন, ফ্রীড, ওয়ারসাইট, ব্যাসার্ধ, রিকার এবং তৃষ্ণার্ত। সিডি ছাড়াও সব ধরনের অনলাইন প্লাটফর্মেই পাবেন ডাকনাম এর এলবাম এবং গানগুলো। এছাড়াও ডাকনাম এর নিজস্ব ওয়েবসাইটেও পাবেন গানগুলো।

ডাকনাম ফেসবুক পেইজ- facebook.com/Daknaam

 

বন্ধুদের জন্য শেয়ার করে দিন

About Dhaka News Time

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: © সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।