সোফিয়ারা ভালো থাকুক, রিবোরা মরে যাক

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সংগঠন আছে, রোবো সাস্ট নাম। আমার সৌভাগ্য, এই সংগঠনের বেশ কয়েকজন মানুষের সাথে আমার মোটামুটি জানাশোনা আছে। আনি নিজেও এই সংগঠনটির সাথে দু-চারদিন ওঠাবসা করেছি। রোব সাস্ট মূলত কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে রোবোটিক্সকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্যে। পাশাপাশি তারা আগ্রহী শিক্ষার্থীদের রোবটিক্সের সাধারণ রীতিনীতিগুলো শেখাবার চেষ্টা করে।

যদিও বলছি, তারা ‘সাধারণ রীতিনীতিগুলো শেখাবার চেষ্টা করে’, আসলে তারা খুব অল্প আয়েসে অনেক কিছুই করে ফেলে। এরই মাঝে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এদের তৈরি বেশ কয়েকটি রোবটের প্রদর্শনী হয়েছে। শুধু প্রদর্শনী, তাই না। এরা বেশ অনেকগুলো পুরস্কারও বাগিয়ে নিয়ে এসেছে ক্যাম্পাসে।

যাই হোক, গেল বছর রোবো সাস্ট রিবো নামে দারুণ একটা সোশ্যাল ইন্টারএকশান রোবট বানিয়েছে। এই রোবটটি বাংলায় কথা বলতে পারে, করমর্দন করতে পারে, কথা বলার সময় চোখ ও চোখের ভ্রু নাচাতে পারে, হাত উপর নিচ করতে পারে। রোবটটি নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় এবং সবচেয়ে মজার কথা নাচতেও পারে।

রিবো সম্ভবত বাংলাদেশের সেরা সোশ্যাল ইন্টারএকশান রোবট। তবে এটিই কিন্তু দেশের একমাত্র সোশ্যাল ইন্টারএকশান রোবট নয়- এর আগে রুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলেও এরকম একটি বাংলায় কথা বলা রোবট বানিয়েছিলেন। আমি খুব নিশ্চিতভাবে জানি না, কিন্তু সম্ভবত বাংলাদেশে আরও বেশ কয়েকটি সোশ্যাল ইন্টারএকশান রোবট ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, এবং এর সবগুলোই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে।

আমাদের দেশে তৈরি এই রোবটগুলো সোশ্যাল ইন্টারএকশান রোবটের জনরাতে একদমই এলিমেন্টারি লেভেলের, খুব সাধারণ এলগরিদম দিয়ে কাজ করে এগুলো- (কৃত্রিম) বুদ্ধিমত্তা যথেষ্টই কম। এ যুগে এসব কথা বলা রোবট দেখে চক্ষু চড়কগাছ হবার জো নেই, সত্যি। কিন্তু যারা এই রোবটগুলো তৈরি করে, তারাই কেবল জানে, নামমাত্র অর্থসরবরাহে এই রোবটগুলো তৈরি করার পেছনের গল্পগুলো। মাত্র কয়েক হাজার টাকার জন্যে এই রোবটিক্স শিখতে চাওয়া ছেলেমেয়েগুলো লোকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়, মাত্র ছত্রিশ হাজার টাকার জন্যে নাসার আয়োজিত রোবটিক্স ক্যাম্পে অংশ নিতে পারে না। তবুও এদের আগ্রহের কমতি নেই। টাকার অভাবে মেটাল বা পলিমার বাদ দিয়ে কেবল ককশিট দিয়ে এরা রোবটের শরীরের নকশা করে। অঙ্গসজ্জা আর প্রযুক্তি যাই হোক না কেন, আমাদের দেশীয় এই রোবটগুলো যখন বৈশ্বিক কোন প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতায় যায়, এরা একটা বৈশিষ্ট্যে সবসময়ই বেশ এগিয়ে থাকে- এরা সাশ্রয়ী! বিদেশী মানুষগুলো যদি জানত, কেন আমাদের দেশের রোবটগুলো তুলনামূলকভাবে এত সাশ্রয়ী হয়!

শুনেছি বর্তমান দুনিয়ার সেরা সোশ্যাল ইন্টারএকশান রোবটটি বাংলাদেশে এসেছে। সত্তরের দশকের জনপ্রিয় ব্রিটিশ অভিনেত্রী অড্রি হেপবার্নের চেহারার আদলে তৈরি সোফিয়া নামের এই হিউম্যানয়েড রোবটটি তৈরি করেছে হং কং ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হ্যানসন রোবটিক্স। সোফিয়া নাকি এরই মাঝে সৌদি আরবের নাগরিকত্বও পেয়ে গেছে এর মাঝে। সারা বিশ্বে এটিই প্রথম একটি রোবটকে নাগরিকত্ব দেয়ার ঘটনা। আমার জানায় যদি ভুল হয়ে না থাকে, এই রোবটটি বাংলাদেশে আসতে খরচ হয়েছে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ষোল কোটি টাকা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি অটোমেশান ইন্সপায়ারিং প্রতিষ্ঠানের সাথে লতায়-পাতায় খানিকটা যুক্ত থাকার কল্যাণে দেশে রোবটিক্স প্র্যাক্টিসের অনেক খবরই পাই। এসব খবরের উপর ভিত্তি করে ধারণা করি, এই ষোল কোটি টাকার এক দশমাংশ পরিমাণ টাকাও যদি আমাদের এই রোবটিক্স শিখতে চাওয়া একদল ছেলেমেয়েগুলোর হাতে তুলে দেয়া যেতো, এরা সোফিয়ার চাইতে উন্নত না হোক, অন্তত তার সমমানের রোবট বানিয়ে ফেলত।

অবশ্য বাংলাদেশে এখন পুরোদস্তুর ডিজিটাল একটি দেশে, পারমাণবিক শক্তিতে উন্নীত হই হই করছে- এই দেশে রিবোর মত সামান্য একটা রোবটের বানাবার জন্যে এক লাখ টাকা খরচ করাটাই রীতিমত অপচয়। আর আমি কিনা ষোল কোটির এক দশমাংশ দেবার কথা ভাবছি! আমার মাথায় কিচ্ছু নাই! এর চাইতে ষোল কোটি টাকা দিয়ে সোফিয়াকে দেশে নিয়ে আসা অনেক সহজ। তাছাড়া সারাজীবন রক্তমাংসের মানুষকে তেল দেবার পর এখন যন্ত্রকেও তেল দেয়ার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে, এর মাঝে দেশের ছেলেপিলেদের পেছনে টাকা ঢালা তো রীতিমত অন্যায়!

সোফিয়ারা ভালো থাকুক। রিবোরা মরে যাক।

লেখক পরিচিতি: সাইদ আনোয়ার,
শিক্ষার্থী, জিইবি বিভাগ, শাবিপ্রবি

বন্ধুদের জন্য শেয়ার করে দিন

About Dhaka News Time

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: © সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।