১০টি কৌশল যা পড়া মনে রাখতে সাহায্য করবে!

ক্লাসে সবসময় কিছু মানুষ থাকে যারা সবকিছুতে একদম ফাটাফাটি পারফর্ম করে- বিতর্কে তারা পুরস্কার জিতছে, খেলাধুলায় কাঁপিয়ে দিচ্ছে আবার কিভাবে কিভাবে পরীক্ষায় ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড পজিশনগুলোও ধরে রাখছে! আমার মতো সাদামাটা ছাত্র যারা তাদের অনেক সময় এই ব্যাপারটি দেখে কেমন সুক্ষ্ম একটি ঈর্ষা ও ক্ষোভের অনুভূতি জন্ম নেয়, কিন্তু সত্যি কথা হলো তোমার আর তাদের মধ্যে মোটেও তেমন কোন পার্থক্য নেই!

সব কাজে কিছু কৌশল থাকে, সেগুলো জানা থাকলে অনেক কম পরিশ্রমে অসাধারণ ফলাফল পাওয়া যায়, তারা সেগুলো জানে দেখেই ভাল করে। এখন থেকে তুমিও ভাল করবে কারণ সেই কৌশলগুলো আজ জানিয়ে দিচ্ছি তোমাদের!

১. নোট রাখা:

নোট নেওয়া বেশ কষ্টকর একটি প্রক্রিয়া। সাধারণত এটি কেউ শখ করে করতে চায় না। ক্লাসে যখন নোট নেওয়ার প্রয়োজন হয় তখন বেশিরভাগ মানুষ টিচার যা বলছেন সেগুলো কিছু না বুঝে ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ করে খাতায় লিখে নেয়, সেটি করে আসলে তেমন লাভ হয় না। বাসায় এসে পুরো বিষয়টি বুঝে একদম নিজের মতো করে লিখে আবার একটি নোট তৈরি করা (ব্যাপারটি শুনে অনেকের গায়ে জ্বর চলে আসতে পারে, কিন্তু ভাল কিছু পেতে হলে একটু কষ্ট করতেই হয়, তাই না ?) দারুণ কাজের একটি বিষয়।

তুমি কি জানো একদম নিজে থেকে লিখে একটি বিষয়ের নোট তৈরি করলে বিষয়টি মনে রাখার ক্ষমতা ৪০% বেড়ে যায়? 

২. গল্পে গল্পে শেখা:

মানুষের একটি মজার বৈশিষ্ট্য হলো সে গল্প শুনতে অসম্ভব ভালবাসে! ক্লাসে স্যার অনেক কিছু পড়িয়েছেন সেগুলো এখন জিজ্ঞেস করলে কিছু বলতে পারবো না কিন্তু একদিন স্যার পড়ার ফাঁকে একটি গল্প বলেছেন সেটি এতদিন পরেও হুবহু মনে আছে! আমাদের বইগুলোয় ইতিহাস ভূগোল বিষয়গুলো খুব কাঠখোট্টাভাবে লেখা, একগাদা দিন-তারিখ-সংখ্যা দেওয়া থাকে সেগুলো মুখস্থ করতে নাভিঃশ্বাস ছুটে যায়!

কিন্তু তুমি যখন বিষয়টিকে গল্পের মতো করে সাজিয়ে নেবে তখন সেটি অনেকদিন পরও খুব ভালোভাবে মনে থাকবে, মানুষ আর যাই কিছু ভুলুক, গল্প কোনদিন ভুলে না সহজে! এজন্যই অনেকরকম থিওরি-ফর্মুলা-তালিকা ইত্যাদি প্রথম অক্ষরগুলো নিয়ে ছোটখাটো ছড়া বানিয়ে ফেললে সেটি মনে রাখা অনেক সহজ হয়ে যায়!

৩. শব্দ করে পড়া:

ছোট থাকতে জোরে জোরে পড়ার একটি অভ্যাস ছিলো সবার, বড় হতে হতে সেই অভ্যাসটি বেশিরভাগ মানুষের আর থাকে না। তুমি শেষ কবে জোরে জোরে পড়েছ মনে করতে পারো? ব্যাপারটি শুনতে অবাক লাগে- জোরে জোরে পড়া কিন্তু পড়া মনে রাখার জন্য চমৎকার একটি কৌশল! মনে মনে পড়লে অনেককিছু ভাসাভাসা ভাবে দেখে যাওয়া হয় মাথার ভেতর তেমনভাবে গেঁথে যায় না তথ্যগুলো, হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো জোরে জোরে পড়লে তখন বেশ ম্যাজিকের মতো কাজ করে সেটি!

৪. ঘুমানোর আগে পড়তে বসা:

পড়তে বসলে ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি বিচিত্র কিছু নয়, এটি হয় না এমন কথা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তেমন মানুষ খুব বেশি নেই! আমার এক বন্ধু আছে সে এমন ঘুম পেলে বই দাঁতে কামড়ে ধরে হাঁটাহাঁটি করে, প্রক্রিয়াটি শুনতে খুব সুখকর নয় কিন্তু সেটি তার জন্য দারুণ কাজ করে! ঘুম পাওয়ার এই বিষয়টিকে কিন্তু চমৎকারভাবে কাজে লাগানো যায়, তুমি কি জানো ঘুমানোর আগে আগে কিছু পড়লে সেটি মনে থাকার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়?

আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিনে ধারণ করা তথ্যগুলো সাজিয়ে রাখে। দিনের বেলা আমরা পড়ালেখা ছাড়াও নানা রকম কাজে ব্যস্ত থাকি। মস্তিষ্ক কোন স্মৃতিটিকে সাজিয়ে রাখবে কোনটিকে মুছে ফেলবে বলা কঠিন, কিন্তু একদম ঘুমানোর আগে আগে পড়লে সেটি মস্তিষ্ক বেশ যত্ন করে সংরক্ষণ করে তাই মনে থাকার হার বেড়ে যায় অনেকখানি!

৫. নিয়মিত ব্যায়াম করা:

ব্যায়াম করার অনেক উপকার আছে, ব্যায়াম করলে বিভিন্ন হরমোনের নিঃসরণ ঘটে সেগুলো নানারকম কাজে দেয়। মস্তিষ্কে স্মৃতি এবং বিশ্লেষণের যেই অংশটি রয়েছে নিয়মিত ব্যায়াম করলে তার উপাদানগুলো বেড়ে যায়। কর্টিসোল নামে একটি হরমোন রয়েছে সেটি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এমন অনুভূতিগুলোর জন্য দায়ী, এই অনুভূতিগুলো মনে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ঘরে বসে অনেকরকম ব্যায়াম করা যায়, নিয়মিত ব্যায়াম করলে এই ক্ষতিকর হরমোনগুলোর নিঃসরণ রাতারাতি কমে যায়, তখন পড়ায় মন বসাতে পারবে তুমি নিশ্চিন্তে!

৬. গ্রুপ স্টাডি করা:

বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে পড়তে বসলে পড়ার চেয়ে আড্ডাবাজি বেশি হয় স্বাভাবিক, তাই বলে ব্যাপারটি যে কাজের নয় তা বলা যাবে না! মানুষ একটি জিনিস শিখে অনেকরকম উপায়ে- শুনে, পড়ে, লিখে, বলে।  একবার পরীক্ষার জন্য সারাদিন নাক-মুখ গুঁজে বই পড়ে দেখি মাথায় আসলে কিছুই ঢুকেনি, আমি বেশ মনমরা হয়ে ক্লাসে গেলাম। সেখানে অনেকে একসাথে বসে পড়ালেখা করছে, এক বন্ধু বিশাল টপিকটি দুই মিনিটে আমাকে ঝটপট বুঝিয়ে বললো এবং ম্যাজিকের মতো পুরো বিষয়টি আমি ধরে ফেললাম!

গ্রুপ স্টাডির আনন্দ এখানেই- কেউ চুপচাপ বসে থাকে না, সারাক্ষণ কেউ কিছু বলছে শুনছে লিখছে এবং এর মাঝে কখন যে বিষয়টি তোমার মনে গেঁথে যাবে ভাবতেও পারবে না!

৭. ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে পড়া:

সবসময় তুমি ঘরে বসে টিভিতে খেলা দেখো হঠাৎ একদিন টিএসসিতে গিয়ে হইচই করে সবার সাথে খেলা দেখলে, সেই আনন্দের কি কোন তুলনা হয়? অথচ ব্যাপারটি কিন্তু একই- ঘুরেফিরে সেই টিভির পর্দায়ই খেলা দেখছো! কেবল পরিবেশের কারণে পুরো অভিজ্ঞতাটি কেমন রাতারাতি বদলে গেল তাই না? পড়ালেখার ক্ষেত্রেও এই কৌশলটি অনেক কাজে দেয়।

তুমি সবসময় টেবিল চেয়ারে বসে পড়াশোনা করো, আজকে হঠাৎ কয়জন মিলে মাঠে ঘাসের উপর বসে গেলে পড়তে! অবচেতন মন বৈচিত্র্য খুব ভালবাসে, এমনিতে পড়ার টপিকটি বেশ একঘেয়ে টেবিল চেয়ারে বসে পড়লে সেটি হয়তো তোমার মনে থাকতো না, শুধু পরিবেশটি ভিন্ন হওয়ার কারণে অবচেতন মনের একটি দারুণ আগ্রহ জন্মেছে সে খুব যত্ন করে টপিকটি তোমার মাথায় গেঁথে দিয়েছে! তাই মাঝেমধ্যেই পড়ার জায়গাটি পরিবর্তন করলে সেটি দারুণ কাজে দেয়!

৮. অনলাইন ব্যবহার করে পড়ালেখা করা:

পরীক্ষা এসে গেছে, এতদিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি এবার একটু বই খাতার সাথে পরিচয় হওয়া দরকার, আমি বইটি খুলে একেবারে থতমত খেয়ে গেলাম! পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠাজুড়ে অনেক কিছু লেখা। কিছু মাথায় ঢুকছে না। আমার মনে হচ্ছে অথৈ সমুদ্রে ভাসছি, অনেকক্ষণ বোঝার চেষ্টা করে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। আমি তখন টপিকটি নিয়ে 10 Minute School, Khan Academy, YouTube ইত্যাদি সাইটে ঘাঁটাঘাঁটি করলাম এবং কিছুক্ষণের ভেতর টপিকটি সম্পর্কে আমার একটি পরিষ্কার আইডিয়া তৈরি হয়ে গেল!

মস্তিষ্ক একসাথে একগাদা তথ্য পছন্দ করে না, তাই হঠাৎ করে বই খুলে এত বিশাল আলোচনা দেখে বেশ চমকে যেতে হয়! অনলাইনে বিভিন্ন ছোট ছোট ভিডিও/ছবি/লেখার মাধ্যমে খুব ইন্টারেস্টিং ভাবে বিষয়গুলো বোঝানো হয়, তাই খুব কম সময়ে একটি জিনিস ভালোভাবে বুঝতে চাইলে অনলাইনের কোন বিকল্প নেই!

৯. নিয়মিত অল্প করে পড়া:

একটি দেয়াল তৈরি করতে ইটের উপর ইটের অনেকগুলো সারি বসাতে হয়, কেবল একটি সারি দিয়ে দেয়াল তৈরি হয়ে যায় না। আমরা অনেকেই বেশ ফাঁকিবাজ, পরীক্ষার আগের রাতে হুলস্থুল বই উল্টেপাল্টে একটি জগাখিচুড়ি প্রস্তুতি নেই এবং কখনোই বিষয়গুলো ভালোভাবে শেখা হয় না!

কিন্তু বইটি যদি নিয়মিত অল্প অল্প করেও পড়া হয় তবে এটি সেই সারি সারি ইটের মতো কাজ করে, আমাদের মস্তিষ্কে পড়াটি তখন বেশ সুন্দরভাবে গেঁথে যায়। একটি জিনিস একবারে শিখতে যাওয়ার চেয়ে নিয়মিত একটু একটু করে পড়লে সেটি মনে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায় বহুগুণ।

১০. নিজে শিখে অন্যকে শেখানো:

একটি জিনিস শেখার সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে সেটি অন্য কাউকে শেখানো! নিজে পড়লে কেবল পরীক্ষায় পাসের বিষয়টি মাথায় থাকে, ইচ্ছা করে অনেককিছু এড়িয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু অন্য কাউকে শেখানোর জন্য পড়তে গেলে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেব- খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানতে হয় তা না হলে তোমাকে প্রশ্ন করে একদম ঝাঁঝরা করে দেবে মানুষটি!আমি একবার পরীক্ষার আগের রাতে আমার এক বন্ধুকে একটি টপিক পড়িয়েছিলাম, গতকাল দুপুরে আমি কি দিয়ে ভাত খেয়েছি মনে নেই কিন্তু পাঁচ বছর আগে বন্ধুকে পড়ানো সেই টপিকটি নিয়ে এখনও আমি চোখ বুঁজে বলে দিতে পারি! কাউকে শেখাতে গেলে জিনিসটি এত ভালোভাবে জানা হয়ে যায় যে সেটি ভুলবার কোন সুযোগ আর থাকে না!

 

সংগ্রহীতঃ 10 Minute School

বন্ধুদের জন্য শেয়ার করে দিন

About Mohammad Rony

Mohammad Rony
মোহাম্মাদ রনি, বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সর্বাধিক পঠিত অনলাইন ব্লগ সাইট "ঢাকা নিউজ টাইম"এর একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয় নিয়ে বি.বি.এ অনার্স সম্পন্ন করছেন। তিনি পাশাপাশি "ঢাকা আইটি সলিউসন" একজন ডিজিটাল মার্কেটার এবং গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবেও কর্মরত রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: © সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।