জীবনযুদ্ধে জয়ী বড় ছেলের বিসিএস ক্যাডার হয়ে ওঠার গল্প

সাত ভাইবোনের মধ্যে পরিবারের বড় ছেলে তিনি।  জীবনের শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ একজন সফল মানুষ। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ৯ সদস্যের বড় পরিবারে বাবার একার আয় ছিল খুবই অপ্রতুল। অার তাই ছোট বেলাতেই ধরতে হয়েছে সংসারের হাল। প্রত্যন্ত গ্রামে বিদ্যুতের আলো না থাকায় হারিকেনের আলোয় করেছেন পড়াশোনা। এর মাঝেই এসএসসি, এইচএসসিতে করেছেন বোর্ড স্ট্যান্ড। টিউশনি করে ছোট ভাই-বোনদের স্বাচ্ছন্দ্যের সব ব্যবস্থা করলেও নিজে একই শার্ট গায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ায় হয়েছেন বন্ধুদের তিরস্কারের শিকার। তবে সবকিছুকে জয় করে, জীবনের সকল বাঁধা অতিক্রম করে তিনি একজন সফল মানুষ। নাম মো. রবিউল ইসলাম। কর্মরত অাছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারি পুলিশ কমিশনার হিসেবে।

চ্যানেল অাই অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন জীবনের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর গল্প।

৩৩তম বিসএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এ কর্মকর্তার গ্রামের বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া ইউনিয়নের দীননাথ পাড়া গ্রামে। দুরন্ত শৈশব আর কৈশোর কেটেছে সেখানেই। স্কুলে বরাবরই প্রথম ছিলেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। এরই ধারাবাহিকতায় মেধাতালিকায় বৃত্তি পান পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে। তবে বিপত্তি বাঁধে অষ্টম শ্রেণি পাশের পর। সেসময় কমার্সে পড়ার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। তবে তাদের গ্রামের স্কুলে কমার্স না থাকায় বাড়ি থেকে ২০ কিলোমিটার দুরের এক স্কুলে ভর্তি হন। যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত থাকায় রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় করে মাইলের পর মাইল কাঁদামাটির পথ ভেঙ্গে যেতে হতো স্কুলে। এরমধ্যেও এসএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় যশোর বোর্ডে হয়েছেন দশম।

১৯৯৮ সালে এসএসসি পাশের পর মেধার জোরে ভর্তি হন ঢাকা কমার্স কলেজে। সেখান থেকে প্রতি মাসে স্কলারশিপ বাবদ পেতেন ৯০০ টাকা। তখন থেকেই শুরু টিউশনির। টিউশনি করে নিজের খরচ সেসময় নিজেই চালাতেন।

এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় ঢাকা বোর্ড থেকে ১৬তম স্থান অধিকার করেন। এরপর ভর্তি  হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগে। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করাটা তার কাছে ছিলো বিলাসিতার নামান্তর। তাই বই কিনে নিজে নিজেই করেছেন পড়াশোনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে পড়াকালে বন্ধুদের দেখে অ্যাপিয়ার্ড দিয়ে অংশ নেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নির্বাহী অফিসার পদের পরীক্ষায়। সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ঘুরে যায় জীবনের মোড়। হলে থেকেই করতে থাকেন চাকুরি। পাশাপাশি চালিয়ে যান পড়াশোনা। এর মাঝেই ঢাকা ব্যাংকের প্রবেশনারি পদের সার্কুলার হয়। সেখানের পরীক্ষায়ও সফল হন। বেতন ভালো হওয়ায় যোগ দেন সেখানে। এরই মাঝে ঢাকায় বাসাভাড়া করে ভাই-বোনদের নিয়ে আসেন ঢাকাতে। ভর্তি করিয়ে দেন বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

বিসিএসের প্রতি কখনোই তেমন আগ্রহ ছিলোনা মেধাবী এ পুলিশ কর্মকর্তার। তবে ঢাকা ব্যাংকে চাকুরি করাকালে ক্রমশই হাঁপিয়ে উঠছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল। তিনি বলেন: ব্যাংকে প্রবেশ করার পর থেকে বের হবার আগ পর্যন্ত বাইরের পৃথিবী থেকে থাকতে হতো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। রোদ-ঝড় বৃষ্টি কিছুই টের পেতাম না সেসময়। আর তখনই মনে হতে থাকে জীবন এভাবে চলতে পারে না।

এরই মাঝে প্রজ্ঞাপন জারি হয় ২৯তম বিসিএসের। তবে আবেদন করার পর পুরোপুরি ভুলেই গেছিলেন সে কথা। হঠাৎ একদিন শুনতে পান আগামী শুক্রবার বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা।  বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান ও গণিতের ভিতটা ছোট থেকেই ভালো হওয়ায় মোটেও বেগ পেতে হয়নি তাকে। সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন সেখানে।

তবে বিড়াম্বনার মুখে পড়েন লিখিত পরীক্ষার আগে। ব্যাংক থেকে মঞ্জুর হয় না ছুটি। অার তাই খানিকটা রাগ করেই পরীক্ষার আগের দিন ম্যানেজার স্যারের কাছে গিয়ে বলেন: ‘স্যার যা পারেন করেন, আমি চলে গেলাম।’ এই একটি সিদ্ধান্তই আমূল পরিবর্তন এনে দেয় এ কর্মকর্তার জীবনে। আনসার ক্যাডারে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন তিনি। এরপর ট্রেনিং করে চাকুরিতে যোগদান করতে করতে চলে যায় ৩০ ও ৩১তম বিসিএস।

৩৩তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন জারি হলে রবিউলের এক বন্ধু অনলাইনে তার ফরমটি পূরণ করে দেন। সেখানেও প্রিলিমিনারিতে সফল হন তিনি। সৌভাগ্যবশত লিখিত পরীক্ষার আগে অফিস থেকে পেয়ে যান লম্বা  ‍ছুটি।  সেজন্য প্রয়োজন হয় না আলাদা করে অফিসকে জানিয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়ার অনুমতির। আর এতেই ঘটে বিপত্তি। মৌখিক পরীক্ষার সময় অফিস থেকে ছাড়পত্র চাইতে গেলে দেয়া হয় না ছাড়পত্র।

মৌখিক পরীক্ষা ছিলো সোমবার। পূর্বেই অবেদন করে রাখার পরও বৃহস্পতিবার অফিসে যেয়ে মেলে না ছাড়পত্র। সেদিনই অফিস করে চলে আসেন ঢাকায়। অপেক্ষায় থাকেন রোববারের। রোববার সকালে চলে যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখানে সারাদিন অপেক্ষার পর বিকেলে মেলে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি। এরপর ৩৩তম বিসিএসে ৩৩তম হয়ে যোগ দেন বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে। বর্তমানে  কর্মরত অাছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারি পুলিশ কমিশনার হিসেবে।

বাবাকে হারিয়েছেন ৫ মাস আগে আর তাই মায়ের মুখের হাসি আর ভাইবোনদের সুখই তার এখন একমাত্র চাওয়া। ভাইবোনের  নিমিত্তে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া পুলিশ কর্মকর্তা রবিউলের প্রার্থনা, ভাই-বোনগুলো যেন বেড়ে ওঠে প্রকৃত মানুষ হয়ে আর সৎভাবে যেন করতে পারে জীবন নির্বাহ। তিনি বিশ্বাস করেন, সদিচ্ছাই বদলে দিতে পারে সবকিছু।

বন্ধুদের জন্য শেয়ার করে দিন

About Dhaka News Time

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: © সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।